বিশেষ প্রতিবেদন

রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের নবাই বটতলা ধর্মপল্লীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার তীর্থোৎসব। দিনাজপুর ধর্মপ্রদেশের বিশপ সেবাষ্টিয়ান টুডু ১৫ ও ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মারীয়া ভক্তবিশ্বাসী, ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টার তীর্থে অংশগ্রহণ করেন। আগেরদিন বিকালে বিশপ ও ফাদারদের পাহাড়িয়া, মাহালী, উঁরাও ও সাঁন্তালী নৃত্য সহযোগে বরণ করে নেওয়া হয়। সন্ধ্যায় আলোক শোভাযাত্রা, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে নবাই বটতলাতে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের ওপর ডকুমেন্টারি, মা মারীয়ার ওপর আলোচনা, পবিত্র সাক্রামেন্তীয় আরাধনা ও নিরাময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ভক্তবিশ্বাসীরা রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার নিকট শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। উল্লেখ্য যে, মারীয়াভক্ত বিশ্বাসীদের আধ্যাত্মিক প্রস্তুতিস্বরূপ নবাই বটতলাতে নয়দিনের নভেনাও অনুষ্ঠিত হয়।

তীর্থের খ্রিস্টযাগের উপদেশে বিশপ সেবাষ্টিয়ান টুডু বলেন, নবাই বটতলাবাসী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রাণ বাঁচানাের জন্য মা মারীয়ার নিকট ভরসা করেছিলেন। আর মা মারীয়া ঠিকই তাঁর স্নহেরে আঁচলে ভক্তবিশ্বাসীদের রক্ষা করেছেন। মঙ্গলসমাচারের আলােকে তিনি আরাে বলেন, মা মারীয়া যেমন কানা নগরের বিবাহ উৎসবে দ্রাক্ষারস ফুরিয়ে গেলে তা যিশুকে জানান। তেমনি আমাদের সকল অভাব মা মারীয়া ঈশ্বরের নিকট অর্পণ করেন। তবে আমরা শুধু অভাব ও বিপদেই মা মারীয়ার শরণাপন্ন হই। মা মারীয়ার নিকট প্রতিমূর্হুতে নিজেকে সমর্পণ করতে হয়।

সুন্দর ও প্রার্থনাপূর্ণ আয়ােজনের জন্য রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের ভিকার জেনারেল ফাদার ফাবিয়ান মারাণ্ডী সবাইকে ধন্যবাদ জানান। নবাই বটতলা ধর্মপল্লীর পাল পুরােহিত ফাদার স্বপন পিউরিফিকেশন মা মারীয়ার নিকট গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আপনাদের প্রত্যেকের সহযোগিতা এই তীর্থোৎসবকে আরো সাফল্যমণ্ডিত করে তুলেছে। তিনি সবাইকে মা মারীয়ার আদর্শে পথচলার আহ্বান জানান।

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, স্বাধীনতা যুদ্ধচলাকালীন নবাই বটতলা গ্রামের সাহসী ও ধর্মপ্রাণ লক্ষ্মণ মাস্টার ও লুইস মাস্টারের অভয়বাণী ও ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রামবাসীকে সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। গ্রাম্যসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক রবিবার গির্জায় গির্জা পরিচালক লক্ষ্মণ মাস্টার ঘোষণা করেন, “আমরা প্রতিদিন রোজারীমালা প্রার্থনা করে মা মারীয়াকে বলবো-“মা তুমি যদি তোমার সন্তানদের এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা করো, তাহলে প্রত্যেক বছর আমরা তোমার নামে পর্ব পালন করবো।” তিনি সবাইকে অভয় দিয়ে আরও ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা কেউ গ্রাম ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যাবো না। মরতে যদি হয় গ্রামের লোক সকলে এক সাথে মরবো। কোনদিন যদি রাজাকার, আলবদর অথবা পাকবাহিনী গ্রামে আসে তবে ঘন্টা বাজানো হবে এবং ঘন্টা শোনামাত্র সবাইকে গির্জা ঘরে এসে সমবেত হতে হবে।”

গ্রাম সভার সিদ্ধান্ত এবং গির্জায় ঘোষণার ২/৩ দিন পর সকালের সূর্য সবেমাত্র পূর্বাকাশে দেখা দিয়েছে এমন সময় গ্রামবাসীরা দেখতে পেল গ্রামের দক্ষিণ দিক থেকে প্রায় ১০০ জনের মত পাকসেনা ও আলবদর রাজাকারেরা নবাই বটতলা গ্রামের দিকে আসছে। রাজাকারদের আসতে দেখে পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গির্জার ঘন্টা বাজানো হলো। ঘন্টা শুনে গ্রামের লোকজন সবাই দ্রুত গির্জাঘরে এসে সমবেত হলো। তারা গির্জায় মা মারীয়ার নিকট রোজারীমালা প্রার্থনা করতে লাগলো। পাক হানাদারেরা এসে দেখে গ্রামের অধিকাংশ লোক গির্জা ঘরের মধ্যে গাদাগাদি করে বসে প্রার্থনা করছে। চারটি জানালায় দু’জন করে এবং দুই দরজায় দু’জন করে পাকসেনা রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে; যেন কেউ গির্জা ঘর থেকে বের হতে এবং পালাতে না পারে।

এরপর গির্জার ভিতরে প্রবেশ করে প্রায় ছয়জন সৈন্য। সেনারা গির্জায় প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান করতে থাকে। গির্জা ঘরে অবস্থানরত কয়েক জনকে তারা রোজারী প্রার্থনা ও ক্রুশের চিহৃ করতে বলে। প্রাণভয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল বেশকিছু হিন্দু ও মুসলমান নারী পুরুষ। মূলত: দৈব্যক্রমে তাদেরকেই খান সেনারা নানা প্রশ্ন করে। তারা প্রার্থনা ও ক্রুশের চিহৃ করতে আসলেই জানত না। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে লক্ষ্মণ মাস্টার খানদের প্রশ্নের উত্তর দেন যে, “আসলে তারা এত বেশি ভয় পেয়েছে যে, তারা কথা বলতেই পারছে না।” খান সেনারা গির্জা ঘরের ভিতরে আর কোন রকম বাড়াবাড়ি না করে ১০/১২ জন সাঁওতাল যুবককে ধরে নিয়ে গুলি করার জন্য লাইনে দাঁড় করানো হয়। তবে পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাপ্টেনের নিদের্শে সৈন্যরা আর গুলি করেনি। সৈন্যরা গ্রাম ছেড়ে ফিরে যাবার সময় কয়েকটি বাড়ির ছাউনীতে আগুন দিলেও তা পুড়েনি। এরপর থেকে প্রতিবছর মা মারীয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রথমে পর্ব  এবং পরবর্তীতে তীর্থোৎসব পালন করা হচ্ছে।

আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লী থেকে আগত মারীয়াভক্ত মাইকেল কিস্কু বলেন, প্রতিবছর আমি রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার এই তীর্থে অংশগ্রহণ করি। এই বছরের তীর্থ আমার জন্য একটু ব্যতিক্রম। রক্ষাকারিণী মা মারীয়ার নিকট বিশেষ কারণে আমার মানত ছিলো। তাই মা মারীয়াকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি।

 

Please follow and like us: