প্রায়শ্চিত্তকাল: পাপ থেকে মন ফিরানোর সময়
খ্রিস্টেতে প্রিয় ভাই-বোনেরা,
আমরা সকলেই জানি ভস্মবুধবার দিন আমাদের কপালে ভস্ম বা ছাই মেখে কাথলিক মণ্ডলিতে আমরা প্রায়শ্চিত্তকাল বা উপবাসকাল শুরু করি। এই সময়টি হলো আমাদের জন্য একটি পবিত্র সময়- কারণ এই সময়ে আমরা পাপ থেকে মন পরিবর্তনের আহ্বান ও সুযোগ লাভ করি। মরুভূমিতে যিশুর ৪০ দিন উপবাস ও ত্যাগস্বীকারের (মথি ৪:১-১১) ঘটনা স্মরণ করে আমরাও ৪০ দিন ধরে উপবাস করি ও ত্যাগস্বীকার করে নিজেদের পবিত্র বা শুচি করে তুলি। এই সময় আমরা নিজের পাপ স্বভাব ও মন্দ অভ্যাসকে দমন করি আমাদের প্রার্থনা, বিভিন্ন ত্যাগস্বীকার বা কৃচ্ছতাসাধন ও দয়ার কাজ করে। শয়তানের প্ররোচনা ও পাপের প্রলোভনকে যদি আমরা জয় করার চেষ্টা না করি তাহলে বৃথা হবে আমাদের প্রায়শ্চিত্তকাল পালন।
যিশু যখন মরুভূমিতে উপবাস ও ত্যাগস্বীকার করছিলেন, শয়তান তাঁকে বিভিন্ন প্রলোভন দিয়েছিল। প্রথমত: যিশু ক্ষুধার্ত ও দুর্বল হয়ে পড়লে শয়তান তাঁকে বলেছিল যেন তিনি মরুভূমির পাথরগুলোকে রুটিতে পরিণত করে তা ভক্ষণ করেন। যিশু শয়তানকে উত্তর দিয়েছিলেন, “মানুষের জীবন শুধু রুটিতে বাঁচেনা বরং ঈশ্বরের বাণীতেও বাঁচে”। দ্বিতীয়ত: শয়তান যিশুকে মরুপর্বতের উপর থেকে বিস্তৃত বিশ্বের সব কিছু দেখিয়ে বলেছিলো, “তুমি যদি আমাকে শ্রদ্ধা-প্রণাম কর তাহলে এই সব কিছু তোমাকে দেওয়া হবে”। যিশু কিন্তু শয়তানকে উত্তর দিয়েছিলেন, “শাস্ত্রে লেখা আছে ‘তুমি কেবল তোমার প্রভু ঈশ্বরকে পূজা করবে, কেবল তাঁরই সেবা করবে”। তারপর শয়তান যিশুকে জেরুশালেমের মহামন্দির-চূড়ায় নিয়ে গিয়ে বলেছিলো, “তুমি এখান থেকে লাফ দিয়ে পড়ো, কারণ শাস্ত্রে লেখা আছে যে স্বর্গদূতেরা তোমাকে মাটিতে পড়ে আঘাত পেতে দিবে না, তোমাকে নিরাপদ রাখবে”। যিশু কিন্তু উত্তর দিয়েছিলেন, “তুমি তোমার প্রভু ঈশ্বরকে পরীক্ষা করতে যেও না”। প্রায়শ্চিত্তকালে বা উপবাসকালে আমরা অনুধ্যান করে দেখি, আমরা যিশুর স্থানে হলে কি করতাম?
আমরা হয়তো শয়তানের ফাঁদে পা দিতাম কারণ আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হয় শয়তান তো খারাপ কিছু বলেনি! আমাদের ক্ষুধা লাগলে তো কষ্ট লাগে, তাই আমরা ক্ষুধা নিবৃতির জন্য শয়তানের কথা অনুসারে কাজ করতাম। আর টাকা-পয়সা ও ধন-দৌলত কে না চায়? আমরা সবাই তো সঞ্চয় ও লাভের চিন্তা এবং চেষ্টা করি। সুতরাং শয়তান যদি তা দেয় তা নিব না কেন? আমরা যে কোন ভাবেই হোক আমাদের লাভের চেষ্টাই করতাম। আমরা তো এখনো সব সময় ঈশ্বরকে পরীক্ষা করি ও লোভও দেখাই; কারণ আমরা যখন প্রার্থনা করি বা মানত করি তখন তো আমরা ঈশ্বরের ইচ্ছা মানার চেয়ে বরং আমাদের ইচ্ছা অনুসারে যেন ঈশ্বর কাজ করেন সেই চেষ্টা করি। আর যদি তা না হয় আমরা ঈশ্বরের উপর আর বিশ্বাস রাখি না। আমরা পরকালের চিন্তা বাদ দিয়ে বরং এই জগতের লাভ-লোকশান, স্বার্থপর চিন্তা-ভাবনা ও অন্যায্য আচরণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জীবন যাপন করি। এই প্রায়শ্চিত্ত বা উপবাসকালে আমরা আমাদের এই পাপময় স্বভাব থেকে মুক্ত থাকতে চেষ্টা করতে পারি।
এই সময় আমরা যিশুর ক্রুশবহন, যাতনাভোগ ও যন্ত্রণাময় ক্রুশ মৃত্যুর কথাও স্মরণ করি। আমরা ক্রুশের পথ করার সময় যিশুর ক্রুশ বহনের সাথী হই এবং সিরেনবাসী শিমনের মত যিশুর ক্রুশ আমাদের কাঁধে তুলে নেই। এই কাজ তো আরামের নয়, বরং কষ্টের। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ত্যাগস্বীকার, উপবাস ও দয়ার কাজের দ্বারা প্রায়শ্চিত্তকালে আমাদের বিশ্বাসের সাক্ষ্য দান করবো বলে অঙ্গিকার করি। তাছাড়া উপবাস মানে হলো “ঈশ্বরের নিকট বাস করা”। আমরা যে না খেয়ে থেকে সংযম করি, নিজেকে কষ্ট দেই, নিজেকে সংযত বা দমন করে চলি তা আমাদের পাপের স্বভাব বা মন্দ অভ্যাসগুলোকে জয় করতে সহায়ক হয়। এইভাবে আমরা ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি, কারণ পাপের স্বভাব নিয়ে বা পাপের কাজ করে আমরা ঈশ্বরের কাছে যেতে পারি না।
ত্যাগস্বীকারের এই সময়ে আমরা আরও নিবিষ্ট মনে প্রার্থনা ও ধ্যান করব যেন আমরা আমাদের পাপের স্বভাব ও পাপের প্রলোভনগুলো জয় করার শক্তি পেতে পারি। এটা একজন পাহারাদারের কাজের মত। একজন পাহারাদার যেমন সচেতন হয়ে দেখে যেন বাড়িতে বা প্রতিষ্ঠানে কোন চোর প্রবেশ করতে না পারে; তেমনি আমরা উপবাস, ত্যাগস্বীকার, সংযম ও আরো নানা উপায়ে সচেতন থাকি যেন পাপের প্রলোভনে না পড়ি বা পাপ না করি। শয়তানের হাত থেকে বাঁচার জন্য নিজেকে আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী করে তুলি যেন আমরা শয়তানের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হতে পারি।
এই সময়টা আমাদের আহ্বান হলো পরার্থপর হওয়া। আমরা অতিরিক্ত কৃপণতার প্রলোভনের বশবর্তী না হয়ে আমরা আমাদের দরিদ্র ও অসহায় ভাইবোনদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করি। আমরা যেন আমাদের প্রতিবেশীদের প্রতি নির্দয় বা নিষ্ঠুর না হয়ে বরং তাদের প্রতি দয়ালু হই। আমাদের উপবাস ও ত্যাগস্বীকারের ফলে আমরা যা সঞ্চয় করি, তা যেন আমাদের অভাবী, অসহায় ও অসুস্থ ভাই-বোনদের দান করি। উপবাস বা ত্যাগস্বীকারের কাল আমাদের সুযোগ এনে দেয় যেন দয়া ও ভালবাসার কাজ করে আমরা আমাদের পরকালর জন্য পুণ্য সঞ্চয় করতে পারি। দরিদ্র, অসহায় ও অসুস্থ ভাই-বোনরা যিশুরই প্রতিভূ অর্থাৎ দরিদ্র, অবহেলিত, অসহায়, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ভাই-বোনদের মধ্যেই আমরা যিশুকে ভালবাসি।
যিশু বলেছেন “এই অসহায় ও অবহেলিত ভাই-বোনদের প্রতি তোমরা যা করেছ, তা আমারই প্রতি করেছ” (মথি ২৫:৪০)। এই প্রসঙ্গে শিশু ও নারীদের প্রতি আমাদের সমাজ ও পরিবারে আমরা কেমন আচরণ করি তা আমাদের ভেবে দেখতে হবে। আমরা কি সর্বক্ষেত্রে তাদের মানবীয় মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে চলি? তাদের প্রতি উপযুক্ত সম্মান ও ভালবাসা প্রদর্শন করি? আমরা কি তাদের সাথে অমানবিক আচরণ করি? আমরা কি অন্যায্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করি? আমরা কি দরিদ্র ও দুর্বলদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করি? আমরা কি আমাদের প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি নির্দয় আচরণ করি? আমরা কি অন্যদের সঙ্গে অতিরিক্ত রাগারাগি ও গালাগালি করি? তাদের বিষয়ে কি নির্দয় সমালোচনা করি, কুৎসা রটাই? তাদের বিষয়ে কি মিথ্যা অপবাদ দেই? এই উপবাস বা প্রায়শ্চিত্তকালে আমরা অনুধ্যান করব যেন আমাদের জীবনকে শুদ্ধ, সুন্দর ও অন্তর-মনে রূপান্তরিত করে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করতে পারি। সকলকে জানাই প্রায়শ্চিত্তকালীন শুভেচ্ছা।
বিশপ জের্ভাস রোজারিও
রাজশাহী






