অমিত জন কস্তা
কপালে ভস্ম বা ছাঁই মেখে নিজ জীবনে কৃত ভুলের কথা স্মরণ করে অন্তরে অনুতাপ নিয়ে পিতার কাছে ফিরে আসার বাসনা নিয়ে আমরা শুরু করি এই প্রায়শ্চিত্তকাল। একইসঙ্গে অন্তর-গভীরে আমাদের জীবনের নশ্বরতা, ক্ষণস্থায়িত্বতা উপলব্ধিতে আনি এবং নিজেদের পাপময়তার কথা স্মরণ করি। প্রার্থনা, উপবাস, ত্যাগস্বীকার, প্রায়শ্চিত্ত, দয়ার কাজের মধ্যদিয়ে মন পরিবর্তন করে পুনরায় পিতার কাছে ফিরে আসার সাধনায় নিয়োজিত হই। এই কালকে আবার ‘আত্মার বসন্তকাল’ও বলা হয়, কারণ মণ্ডলী এই কাল আমাদের কাছে উপহার দেয় যেন আমরা আমাদের জীবনের জরা-জীর্ণতা, পাপ-পঙ্কিলতার আবরণ থেকে বের হয়ে নববেশে নবসাজে সেজে উঠি এবং নতুন মানুষ হয়ে উঠার এই বিশেষ সময়কে যথোপযুক্তভাবে কাজে লাগিয়ে দেহ-মন-আত্মাকে নতুনভাবে সাজিয়ে তুলি। এই সাঁজ লোকের প্রশংসা কুড়ানো কোন বাহ্যিক সাঁজ নয়, বরং তা অন্তরের সাজ।
মনের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবৎ পুষে রাখা অন্যের প্রতি ক্ষোভ, রাগ, ঘৃণা ঝেরে ফেলার মোক্ষম সময়। কুচিন্তা ও অসৎ অভিপ্রায়, অন্যের ক্ষতি করার ও নিজেকে জাহির করার মনোভাব ত্যাগ করে নম্রতা, কোমলতা ও ক্ষমার জীবন গঠন করার নতুন করে শপথ নেওয়ার সময়। অন্যকথায়, অন্তরে নবীকৃত হওয়ার সময়। মাণ্ডলীক আহ্ববান হলো- আমরা যেন এই কালে যিশুর যাতনাভোগ ও কষ্টভোগ নিয়ে ধ্যান ও চিন্তা করি এবং যিশুর সাথে আমাদের পাপের মৃত্যু ঘটায়, যেন যিশুর সাথে পুনরুত্থানের আনন্দ ও শান্তি নিজ জীবনে অভিজ্ঞতা করতে পারি।
যিশুর মৃত্যুর সাথে আমাদের পাপময় জীবনের মৃত্যু ঘটানোর জন্য প্রয়োজন আমাদের নিজ নিজ ব্যক্তি জীবনের প্রতি এক গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করার; নিজ জীবনকে আরেকটু খতিয়ে দেখার। অন্যভাবে বলতে গেলে, নিজের সমালোচনা করার ও নিজেকে বিশ্লেষণ করার। প্রবক্তা যোয়েল সেই উদাত্ত আহ্বান, “নিজেদের পোশাক নয়, নিজেদের হৃদয়টা-ই ছিঁড়ে ফেল তোমরা; তোমাদের ঈশ্বর ভগবানের কাছে আবার ফিরেই এসো! তিনি যে দয়াময়, করুণানিধান; তিনি তো সহজে ক্রুদ্ধ হন না, মহাকৃপাশীল তিনি, অমঙ্গল ঘটানোর সঙ্কল্প পালন থেকে বিরত-ই হন। (যোয়েল ২:১৩) আমরা যেন সেই আহ্বানে সাড়া দেই। আজকের মঙ্গলসমাচার আমাদের পুণ্য অর্জন ও পবিত্র হয়ে ওঠার তিনটি উপায় বা মাধ্যম আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। প্রার্থনা, ভিক্ষা বা দয়ার কাজ ও উপবাস।
প্রার্থনা
ঈশ্বরের সাথে এক গভীর জীবন-সংলাপ। বিনম্র হৃদয়ে ঈশ্বরের অনুগ্রহ যাচনা করা। ঐশ আশীর্বাদ লাভ ও পুণ্য জীবন যাপনের এক বড় শক্তি। ঈশ্বরের সাথে এক গভীর সংযোগ ও সম্পর্ক গড়ার উপায়। জীবনের যাত্রায় তাঁর প্রতি আমাদের আস্থা ও নির্ভরতা বাড়ানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম। প্রার্থনা হলো এক ঐশ উপলব্ধি যা আমাদের আমাদেন দুঃখ-কষ্টে তাঁর উপস্থিতি ও ভালোবাসা উপলব্ধি করার ক্ষমতা দান করে। পুণ্যপিতা পোপ এই বছর তাঁর তপস্যকালীন বাণীতে শ্রবণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, “শ্রবণের আকাঙ্খা হলো কারো প্রতি সম্পর্ক স্থাপনে আমাদের আকাঙ্খার প্রকাশ।” আর প্রার্থনা হলো সেই সম্পর্ক স্থাপনের উপায়। এই প্রায়শ্চিত্তকালে আমাদের প্রার্থনার ধরন হতে পারে প্রতিদিন ব্যক্তিগতভাবে গির্জায় রাখা সিন্দুকে খ্রিস্টপ্রসাদের আকারে যিশুর সামনে বসা ও নিজের ও অন্যের জন্য প্রার্থনা করা। প্রার্থনায় আমরা ঈশ্বরের দয়া ও মহানুভবতায় প্রতি আস্থা রাখতে শিক্ষা দেয়। প্রার্থনা আমাদের জীবন মূল্যায়ন করতে ও পুণ্য মানুষ হয়ে ওঠার শক্তি হিসেবে কাজ করে।
এই তপস্যাকাল আমাদের আহ্বান জানায় নিজেদেরকে আরো দয়ালু দরদী মানুষ রূপান্তরিত করার। যিশু বলেন, “তোমাদের পরম পিতা যেমন দয়ালু, তোমরা তেমনি দয়ালু হও।” দয়ার কাজ কিংবা দান করা ত্যাগস্বীকার ব্যতীত কখনই সম্ভব নয় । তাই এই তপস্যাকালে আমাদের সাধনা হোক ক্ষুদ্র্র ত্যাগস্বীকার করা এবং সেই ত্যাগের ফসল অন্যের প্রয়োজনে অন্তর থেকে দান করা।
উপবাস
উপবাস হলো নিজের কুঅভ্যাস ও কুচিন্তা থেকে বিরত থাকার একটি উৎকৃষ্ট উপায়। বলা হয়ে থাকে, শারীরিক কষ্ট আমাদের আত্মার জন্য মঙ্গলজনক। পুণ্যপিতা চর্তুদশ লিও তাঁর তপস্যাকালীন বাণীতে বলেন, এই তপস্যাকালে আমাদের উপবাস হতে পারে সেই সমস্ত রূঢ় কিংবা রুক্ষ কথা থেকে বিরত থাকা যা আমার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। আমরা যেন আমাদের মুখের ভাষা বা কঠোর বুলি ও তৎক্ষণাৎ বিচার করা এবং অন্যের নিন্দা করা, অন্যের বিষয়ে কুৎসিত মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকি।
পোপ আরোও বলেন, উপবাস আমাদের বুঝতে সাহায্য করে আমরা কিসের প্রতি ক্ষুধার্ত এবং আমাদের বেঁচে থাকার জন্য কোনটিকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। উপবাস আমাদেরকে ন্যায্যতার প্রতি তৃষ্ণাকে বাচিঁয়ে রাখতে সাহায্য করে। উপবাস আমাদেরকে অনের জন্য প্রার্থনা করতে ও অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করতে সাহায্য করে। তাই এই উপবাসকাল হোক আমার মন্দঅভ্যাস, মন্দচিন্তা, অসৎ মনোবাসনা ত্যাগ করার সাধনাকাল।
আগেই উল্লেখ করেছি এই কাল হলো আত্মশুদ্ধির কাল। আত্মবিশ্লেষণ বা আত্মসমালোচনা ছাড়া আত্মশুদ্ধি কখনই সম্ভব নয়। আত্মবিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন আমাদের একটি উন্মুক্ত ও অকপট মন। আমাদের ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুটিয়ে দেখা- কেমন প্রকৃতির মানুষ আমি। নিচে কয়েকটি গল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষের পরিচয় পাবো যা আমাদেরকে নিজেদের পরিচয় পেতে ও নিজেদেরকে চিনতে সাহায্য করবে । আর তখনি এই তপস্যাকালে নিজেদের পরিবর্তন করতে সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস।
ব্যক্তিত্ব্যের ধরণ
ধরণ ১: যে মানুষ ভালো দেখতে জানে না
এই ধরনের মানুষ কেবল মানুষের মন্দ ও অন্ধকার দিকগুলোর প্রতিই দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। সামান্য ত্রুটিকে তারা এমনভাবে অতিরঞ্চিত করে তোলে, যেন সেটাই পুরো সত্য। অনেক সময় ঈর্ষা, বিদ্বেষ কিংবা নিজের ভেতরের অনিরাপত্তাবোধ থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হয়। অন্য মানুষের মধ্যে যে ভালো গুণগুলো আছে, সেগুলো তারা দেখতে পায় না-বা দেখতে ইচ্ছা পোষণ করে না। আপনি যতই তাকে কারও মহত্ত্ব বোঝাতে চেষ্টা করুন না কেন, তাদের মন বদলানো বা ভুলানো সম্ভব নয়। কারও মুখে থাকা একটি ছোট দাগও তাদের চোখে এমন হয়ে ওঠে, যেন তার পুরো শরীরটা কাদায় মাখা। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প খুবই প্রাসঙ্গিক।
একটি পাড়ায় একটি সুন্দর বাড়িতে থাকত এক তরুণ দম্পতি। অকারণেই স্ত্রীটি পাশের বাড়ির মহিলাটিকে অপছন্দ করত। এক সকালে প্রাতঃরাশ সারতে সারতে সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল, প্রতিবেশী মহিলা কাপড় ধুয়ে রোদে দিচ্ছেন। সে বিরক্ত স্বরে স্বামীকে বলল, “ওটা দেখেছ? কাপড়গুলো কত নোংরা! ধোয়ার পরেও পরিষ্কার হয়নি। ভাবতেই আশ্চর্য লাগে-এত বয়সের একজন গৃহিণী হয়েও সে ঠিকভাবে কাপড় ধুতে জানে না। মনে হয় তাকে আবার মায়ের বাড়ি গিয়ে শিখে আসতে হবে!” স্বামী চুপচাপ শুনল। দিনের পর দিন প্রতিবেশী যখনই কাপড় রোদে দিত, স্ত্রীটি বিদ্রুপ করতে ভুলত না। কয়েক সপ্তাহ পর একদিন স্ত্রী আবার জানালার দিকে তাকাল। আজ দৃশ্যটা আলাদা। সে বিস্মিত সুরে বলল, “ কি আশ্চর্য! আজ কাপড়গুলো একেবারে পরিষ্কার! নিশ্চয়ই সে নিজে ধোয়নি-অন্য কেউ ধুয়ে দিয়েছে!” স্বামী তখনও আসন ছাড়েনি। শান্ত কণ্ঠে সে বলল, “জানো প্রিয়, আজ ভোরে আমি আমাদের জানালাগুলো পরিষ্কার করেছি।”
গল্পটি আমাদের এই বিষয় খুবই স্পষ্ট করে উপস্থাপন করে যে-আমরা অন্যদের মধ্যে যা দেখি, তা অনেকটাই নির্ভর করে আমরা কোন জানালা দিয়ে তাকাচ্ছি তার ওপর? কেবল দৃষ্টিভঙ্গিরূপ চশমা দিয়ে তাকাচ্ছি তার ওপর। নিজের অন্তরের জানালা পরিষ্কার করলে, দৃষ্টিও পরিষ্কার ও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। আর দৃষ্টি পরিষ্কার হলে, পৃথিবীকেও নতুন করে দেখা যায়।
ধরণ ২: যে ব্যক্তি ভালো ও খারাপ–দুটোই দেখে, কিন্তু ভালো দিকটি উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
দ্বিতীয় ধরনের মানুষ অন্যদের মধ্যে ভালো ও খারাপ-উভয়ই দেখতে পায়, কিন্তু সচেতনভাবে ভালো দিকটি উপেক্ষা করে এবং খারাপ দিকের ওপরই মনোযোগ দেয়। যেমন কিছু মানুষের শ্রবণশক্তি বাছাই করা হয়, তেমনি এই ধরনের মানুষের মানসিকতাও বাছাই করা-একটি নির্বাচনী মানসিকতা। একবার এক লোক সুপার মার্কেটে কেনাকাটা করছিল। সে তার ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল, আর তার স্ত্রী আকাবাকা হাতে লেখা যে তালিকাটি দিয়েছিলেন সেটি দেখছিল। হঠাৎ সে আরেকটি ট্রলির সঙ্গে ধাক্কা খায়। “দুঃখিত!” সে স্বাভাবিকভাবেই বলে ওঠে। কিন্তু তারপর যা সে যা প্রত্যক্ষ করল, তাতে সে বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। সেই অন্য ট্রলিটি ঠেলছিল একটি কুকুর-আর সে নানা রকম জিনিস তুলে নিচ্ছিল!
বিস্মিত হয়ে লোকটি এক আইল থেকে আরেক আইলে কুকুরটিকে অনুসরণ করতে লাগল, তার প্রতিটি কাজ গোপনে লক্ষ্য করতে লাগল। কুকুরটি ফল, চকলেট, পাউরুটি, পাস্তা-এক ব্যাগ ভর্তি বাজার তুলে নিল। তারপর সে ক্যাশিয়ারের কাছে গিয়ে কয়েকটি ডলার বের করে বিল মেটাল। একঘেয়ে চেহারার ক্যাশিয়ার একেবারেই অবাক হলো না; দেখে মনে হচ্ছিল সে এই লোমশ বন্ধুটির সঙ্গে পরিচিত। এরপর লোকটি লক্ষ করল, ক্যাশিয়ার কুকুরটিকে ১০ ডলার কম ফেরত দিল। কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে ক্যাশিয়ারের প্যান্টের পা টানতে লাগল, যতক্ষণ না সে সঠিক টাকা ফেরত দিল।
“এটা কীভাবে সম্ভব?” লোকটি মনে মনে ভাবতে লাগল, সেখানে দাঁড়িয়ে পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেল। “এই বুদ্ধিমান কুকুরটির মালিক কে-তা আমাকে জানতেই হবে!” লোকটি কুকুরটিকে অনুসরণ করে তার বাড়ি পর্যন্ত গেল-একটি ভবনের পনেরো তলায়। লিফট থেকে নেমে কুকুরটি একটি গাঢ় নীল দরজার সামনে বাজারের ব্যাগটি রেখে দিল। তারপর সে দরজায় আঁচড়াতে লাগল এবং কান্নার মতো শব্দ করতে লাগল, যেন মালিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। কিছুক্ষণ পরে মালিক দরজা খুলল এবং কুকুরটির ওপর চিৎকার শুরু করল। “তুই অকর্মা, অকেজো, কোনো কাজের নশ! আশা করি সবকিছু ঠিকমতো এনেছিস!” তারপর দুজনেই ভেতরে ঢুকে গেল। লোকটি আরও বেশি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। কুকুরটির মালিক কি সত্যিই এমন কথা বলল? কৌতূহলী হয়ে সে দরজায় তিনবার নক করল, নার্ভাস হয়ে আঙুল নাড়াতে নাড়াতে, জানতে চাইল, কেন সে তার এত অসাধারণ কুকুরটির ওপর চিৎকার করল।
“হ্যাঁ?” মালিক রূঢ়ভাবে উত্তরে বলল, “উম্ম… স্যার”। লোকটি বলল, আমার একটা প্রশ্ন ছিল। আমি দেখেছি আপনার কুকুরটি একাই সুপারমার্কেট থেকে পুরো বাজার করেছে, ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে ঠিকঠাক ফেরত নিয়েছে, হেঁটে এই ভবন পর্যন্ত এসেছে, লিফটে সঠিক নম্বর চাপ দিয়েছে-কুকুরটি সত্যিই অবিশ্বাস্য! আপনি তাকে বকাবকি করলেন কেন? আমি কারণটা জানতে চাই।” “হ্যাঁ, ওর পক্ষে এ-সবই স্বাভাবিক। কিন্তু এটা দ্বিতীয়বার যে সে বাড়ির চাবি নিতে ভুলে গেছে। যার কারণে আমাকে উঠে এসে দরজা খুলতে হয়েছে!” লোকটি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল, মুখ হাঁ করে সে যা শুনেছে তাতে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। এটাই কি আমাদের জীবনের গল্প নয়? আমাদের বন্ধু আর পরিবার কত ভালো কাজই না করে, কিন্তু আমরা সেগুলো উপেক্ষা করি এবং শুধু নেতিবাচক দিকগুলোর ওপরই মনোযোগ দিই। আমাদের চারপাশে এবং আমাদের প্রিয় মানুষদের ভেতরে কত সুন্দর সুন্দর বিষয় ঘটছে, অথচ এই ধরনের মানুষ শুধু এটুকুই মনে রাখতে পারে-ও চাবি ভুলে গিয়েছিল!
ধরণ ৩: যে ব্যক্তি ভালো ও খারাপ দুটোই দেখে, কিন্তু সচেতনভাবে খারাপটাকে উপেক্ষা করে
আবার এমন মানুষও আছেন, যারা ভালো ও খারাপ-দুটোই দেখতে পান, কিন্তু সচেতনভাবে খারাপটাকে উপেক্ষা করে ভালো দিকটির ওপর মনোযোগ দেন। এই পথে চলা সহজ নয়, কারণ মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো আগে খারাপটা দেখা। সেই স্বাভাবিক প্রবণতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সচেতন প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সব সময় ভালোটা দেখতে গেলে অনেক পরিশ্রম ও আত্মসংযম দরকার হয়। সম্প্রতি টাইমস অব ইণ্ডিয়া পত্রিকার ‘স্পিকিং ট্রি’ বিভাগে প্রকাশিত প্রয়াত শিল্পপতি আদিত্য বিড়লাকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ এই ধরনের মানুষের বৈশিষ্ট্য খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে।
আদিত্য বিড়লা ছিলেন বহু-বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হিন্দালকো ইন্ডাস্ট্রিজ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সেই প্রবন্ধে বলা হয়েছে, তার প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভুলবশত কোম্পানির বিপুল আর্থিক ক্ষতি করেছিলেন। অন্য কোনো নেতা হলে হয়তো সেই কর্মচারীকে বরখাস্ত করতেন-বা এমনকি তার বিরুদ্ধে মামলা করতেন। কিন্তু আদিত্য বিড়লা তা করেননি।সেই কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আগে বিড়লা একটি নোটপ্যাড নিলেন এবং উপরে শিরোনাম লিখলেন: “এই কর্মচারীর পক্ষে যুক্তিসমূহ”। তারপর তিনি ওই ব্যক্তির সব শক্তির একটি তালিকা তৈরি করলেন-এর মধ্যে ছিল সেই সময়গুলোর কথাও, যখন ওই কর্মকর্তা কোম্পানির জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার লাভ এনে দিয়েছিলেন।
কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা সেই ভুলের মোকাবিলা করার আগে আদিত্য বিড়লা সচেতনভাবে তার মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিলেন এই নির্বাহীর ভালো কাজগুলোর দিকে। যখন কোম্পানির ভেতরে খবর ছড়িয়ে পড়ল যে বিড়লা ওই কর্মচারীকে বরখাস্ত করেননি, তখন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক ধরনের সংবেদনশীল ব্যবস্থাপনার দর্শন ও সংস্কৃতি গড়ে উঠতে শুরু করল। কোম্পানির আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা লিখেছিলেন, “যখনই আমার কাউকে তিরস্কার করার ইচ্ছা হয়, আমি নিজেকে বোঝাই-আগে বসে তার ভালো গুণগুলোর একটি তালিকা তৈরি করতে। এতে হয়তো আমার সিদ্ধান্ত বদলায় না, কিন্তু বিষয়গুলোকে সঠিক প্রেক্ষাপটে দেখতে সাহায্য করে এবং আমার রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখে।” ভালো দিকটির ওপর মনোযোগ দেওয়া এবং খারাপটিকে সঠিকভাবে সামলানো-এই নীতিই সম্পর্ক বাঁচাতে পারে এবং আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
ধরণ–৪: এমন একজন ব্যক্তি যে খারাপ দিকটি একেবারেই দেখতে পারে না; যারা সামান্য ভালোকেও দেখে অতিরঞ্চিতরূপে উপস্থাপন করে।
এই স্তরটিতে পদার্পণ করা কেবল ঈশ্বরের পক্ষে সম্ভব, কিংবা যার আধ্যাত্মিকতার শীর্ষে উন্নীত হয়েছেন কেবল তাদের পক্ষে তা সম্ভবপর। কারো চরিত্রের কেবল ভালো দিক দেখতে পারা, কিংবা সামান্য ভালো বড় করে দেখা যে তার দোষকে ছাপিয়ে যায়। এটি নিঃসন্দেহে একটি মহান কীর্তি। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষের পক্ষে এই স্তরে উন্নয়ন করা কঠিন হয়ে পরে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আমাদের সম্পর্কগুলো যেন সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে, তার জন্য আদর্শ অবস্থান হলো চতুর্থ স্তরে পৌঁছানো। মানব প্রকৃতি এমন যে আমরা অন্যদের দোষ নিয়ে গল্প করতে ভালোবাসি; আমরা আমাদের চোখ খুলে শুধু ময়লা দেখি। তবে অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারি যেখানে আমরা ভালো এবং খারাপ-উভয়ই দেখি, এবং সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিই যে ভালো দিকটি আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হবে এবং খারাপ দিকটি আমরা উপেক্ষা করি। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, “কীভাবে আমরা পুরোপুরি খারাপ দিকটি উপেক্ষা করতে পারি?” খারাপ দিকটি উপেক্ষা করা মানে আমরা তা ব্যবহারিকভাবে মোকাবিলা করি না তা নয়। এর অর্থ হলো আমরা আমাদের মনকে খারাপ দিকের উপর কেন্দ্রীভূত বা পড়ে থাকতে দিই না।”
উপরিউল্লিখিত গল্পসমূহ আমাদেরকে নিজেদেরকে আরও গভীরভাবে জানতে, নিজের দুর্বল ও মন্দ দিকগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভে এবং নিজের ব্যক্তিত্বকে চিহ্নিত করতে সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস। চল্লিশ দিনের এই ত্যাগ সাধনার যাত্রাকালে আমারা যদি নিজেদেরকে একটু একটু করে বদলাতে পারি। তবেই সার্থক হবে আমাদের যিশুর প্রকৃত শিষ্যত্ব। যিশু বলেন, “ কেউ যদি আমার অনুগামী হতে চায়, তবে সে আত্মত্যাগ করুক এবং নিজের ক্রুশ নিয়ে আমার অনুসরণ করুক।” (মথি ১৬:২৪) তাই প্রতিদিন আমাদের ক্রুশ গুলি বহন করে যিশুর ক্রুশের বোঝা একটু একটু করে লাঘব করি। প্রতিদিন আত্মমূল্যায়ন ও আত্মবিশ্লেষণ করে নিজ জীবনকে আরও সুন্দরভাবে সাজিয়ে নতুন মানুষ হয়ে উঠতে পারি। আর এটাই হতে পারে আসন্ন পুনরুত্থান উৎসবে যিশুর সঙ্গে আমার পুনরুত্থান । সার্থক ও সুন্দর হোক আমাদের এই তপস্যাকালীন যাত্রা ও সাধনা। ঈশ্বর আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে সহায় হোন ও আশীর্বাদ করুন।






