ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু, সিএসসি

“বর্তমান এশিয়ায় খ্রিস্টান পরিবারের মিশন ও ভবিষ্যৎ যাত্রার রূপরেখা” মূলভাবকে প্রতিপাদ্য করে এশিয়ার কাথলিক বিশপ কনফারেন্সসমূহের ফেডারেশন (FABC)-এর ‘অফিস ফর ল্যাইটি অ্যান্ড ফ্যামিলি’ (OLF)-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ সিনোডাল সমাবেশ। ১১ থেকে ১৫ মে থাইল্যাণ্ডের ব্যাংককের ক্যামিলিয়ান পাস্টোরাল সেন্টারে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশের মূল লক্ষ্য হলো- আজকের এশীয় সমাজ ও মণ্ডলীর প্রেক্ষাপটে খ্রিস্টান পরিবারের মিশন এবং দায়িত্বকে গভীরভাবে অনুধাবন করা। সমাবেশে এশিয়া মহাদেশের ১১টি দেশের (বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, মালেশিয়া, কুরিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যাণ্ড) ২ জন কার্ডিনাল, ৯ জন বিশপ, ১৬ জন ফাদার, ৪ জন সিস্টার, কয়েকজন যুবা ও ভক্তজনগণসহ মোট ৫২ জন অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ থেকে মিসেস রিটা রোজলিন কস্তা, মি. থিওফিল নকরেক, সিস্টার মেরী অন্তরা, এসএমআরএ, ফাদার স্ট্যানিসলাউস গমেজ, ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু, সিএসসি ও বিশপ ইম্মানুয়েল রোজারিওসহ ৬ জন প্রতিনিধত্ব করেন।

সিনোডাল সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল- পবিত্র আত্মা বর্তমান সময়ে খ্রিস্টান পরিবারের মিশন সম্পর্কে মণ্ডলীকে কী নির্দেশনা দিচ্ছেন তা শ্রবণ করা। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি বা কনফারেন্সগুলোর পারিবারিক সেবা মন্ত্রণালয়ের (family ministry) বিগত দিনের অর্জিত সাফল্য, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা আদান-প্রদান করা। পাশাপাশি, ঐতিহাসিক ‘ব্যাংকক ডকুমেন্ট’-এর আলোকে সাধারণ বিশ্বাসী, নারী, যুবসমাজ এবং মৌলিক খ্রিস্টিয় সমাজ (BEC)-এর আত্মিক ও সামাজিক উন্নয়নে OLF কীভাবে কার্যকর সেবা প্রদান করতে পারে তা নির্ধারণ করা।

এফএবিসি-র ‘অফিস ফর ল্যাইটি অ্যান্ড ফ্যামিলি’ (OLF) এর সভাপতি বিশপ ইম্মানুয়েল কানন রোজারিও সকলকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, (OLF) হলো মণ্ডলীর বৃহত্তম অফিস, যার লক্ষ্য সিনোডাল বা অংশগ্রহণমূলক উপায়ে যুবসমাজ, নারী এবং মৌলিক খ্রিস্টিয় সমাজকে (BEC) নিয়ে একসাথে কাজ করা। তিনি আরো বলেন, এই সমাবেশের মূল লক্ষ্য হলো: মণ্ডলী ও সমাজে নারীর মর্যাদা ও নেতৃত্ব বৃদ্ধি করা, যুবসমাজ মণ্ডলীর ভবিষ্যৎ নয়, বরং বর্তমান; তাদের জীবনের জটিলতায় মণ্ডলীতে সহযাত্রী হওয়া, পরিবারকে ঈশ্বরের বাক্যের একটি জীবন্ত বাসস্থান বা নীড় (Home for the Word of God) হিসেবে গড়ে তোলা এবং পবিত্র আত্মায় সংলাপ পদ্ধতির মাধ্যমে সক্রিয় শ্রবণ ও আধ্যাত্মিক বিচক্ষণতার সাহায্যে মণ্ডলীর ভবিষ্যৎ পথ খোঁজা।

পাঁচদিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় মণ্ডলীর নেতৃবৃন্দ, যেমন- কার্ডিনাল তার্সিসিয়াস ইসাও কিকুচি, কার্ডিনাল পাবলো ভার্জিলিও এস. ডেভিড এবং আর্চবিশপ ফ্রান্সিস জেনিভার ভিরা আরপনড্রাতানা প্রমুখ পবিত্র খ্রিস্টযাগে পৌরহিত্য করেন। সমাবেশের মূল আকর্ষণ হিসেবে ছিল “ফ্যামিলিয়ারিস কনসোর্সিও” (Familiaris Consortio) এবং পোপ ফ্রান্সিসের ”আমোরিস লেতিৎসিয়া” (Amoris Laetitia) বিষয়ক গভীর ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা ও পাস্টোরাল সম্ভাবনা মূল্যায়ন, যা পরিচালনা করেছেন ফাদার বিমল তিরিমান্না। তিনি এশিয়ার বহু-ধর্মীয় বাস্তবতায় মিশ্র পরিবারগুলোকে মণ্ডলী থেকে বিচ্ছিন্ন না করে, পোপ ফ্রান্সিসের Amoris Laetitia- এর আলোকে তাদের কীভাবে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির জীবন্ত সেতু (BHC) হিসেবে দেখা যায় তার উপর জোড় দিয়েছেন।

কার্ডিনাল আম্বো ডেভিড বক্তব্যে বলেন, এশিয়ায় সুসমাচার প্রচারের ভবিষ্যৎ যে কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচির চেয়ে পরিবারে ঈশ্বরের বাক্য নিয়মিত পাঠ ও প্রার্থনার ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, সিনোডাল যাত্রার সামগ্রিক আধ্যাত্মিক ও সাংগঠনিক যাত্রার মূল ভিত্তিটি তিনটি পর্যায়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। প্রথম ধাপে: ঈশ্বরের সাধারণ জনগণ (People of God) স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের মতামত ও বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় ধাপে: মণ্ডলীর বিশপগণ সেই মতামতগুলোকে পবিত্র আত্মার আলোতে অনুধাবন বা (Discernment) করেছেন। তৃতীয় বা বর্তমান ধাপ: বর্তমানে মণ্ডলী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিনতম ধাপে পদার্পণ করেছে- যা হলো কেবল কথা বলা বা পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, প্রকৃতপক্ষে আমাদের বাস্তব জীবনযাপনের পদ্ধতি ও যাজকীয় সেবাকে রূপান্তরিত এবং পরিবর্তিত করা।

এছাড়া, ব্যাংকক ডকুমেন্টের এজেণ্ডা বাস্তবায়নে যৌথ সংলাপ ও দলগত প্রতিবেদন সংশ্লেষণের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। সমাবেশের শেষাংশে FABC সদস্যদের জন্য একটি বিশেষ মূল্যায়ন প্রশ্নাবলী রাখা ছিলো, যার উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় ধর্মপ্রদেশসমূহে পোপের ‘আমোরিস লেতিৎসিয়া’র বাস্তব প্রতিফলন পর্যবেক্ষণ করা। এর মাধ্যমে বিবাহিত জীবনের জন্য ‘ক্যাটেকুমেনাল পাথওয়েজ’ বাস্তবায়নের সফলতা এবং মণ্ডলীর বিভিন্ন কমিশনসমূহের (নারী, যুব, প্রবীণ ও বিইসি) মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বৃদ্ধির মাধ্যমে পারিবারিক পরিচর্যাকে আরও বেশি অংশগ্রহণমূলক বা সিনোডাল করে তোলার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

 

Please follow and like us: